০৩ নভেম্বর ২০২৬ , ১৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬

২৯২ গডফাদার ও চার হাজার কারবারির তালিকা: এবার কি ভাঙবে মাদক সিন্ডিকেট?

আপলোড সময় : ০৩-১১-২০২৬
২৯২ গডফাদার ও চার হাজার কারবারির তালিকা: এবার কি ভাঙবে মাদক সিন্ডিকেট?

অবকাঠামো, শিল্পায়ন বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে কেবল একটি দেশের উন্নয়ন মাপা যায় না। মানুষের কাজ করার সক্ষমতা, সমাজের নিরাপত্তা, নৈতিকতা আর তরুণদের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠাও টেকসই উন্নয়নের অপরিহার্য শর্ত। আর ঠিক এই জায়গাগুলোতেই সবচেয়ে বড় আঘাত হানছে মাদকের বিস্তার। মাদকাসক্তি একজন মানুষের জীবন তো নষ্ট করেই, সেই সঙ্গে পরিবার, সমাজ, অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তার সামনেও গুরুতর হুমকি তৈরি করেছে। এ কারণে মাদকের বিরুদ্ধে কার্যকর ও আপসহীন অবস্থানকে বাংলাদেশের প্রধান জাতীয় অগ্রাধিকারগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা এখন সময়ের দাবি।

মাদক নিয়ন্ত্রণে জিরো টলারেন্স নীতি নিয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। এই নীতি ঠিকমতো কার্যকর হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে, কমতে পারে অর্থনৈতিক ক্ষতি, আর ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষার ক্ষেত্রেও আসতে পারে বড় পরিবর্তন। মাদকের অভিশাপ থেকে দেশকে মুক্ত করা গেলে উন্নয়নের পথে বাংলাদেশ আরও দ্রুতগতিতে এগোবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি হিসাব উল্লেখ করে বলা হয়েছে, মাদক ও ধূমপানের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রতিবছর ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছে। মাদকের প্রভাবে মানুষের নানা রকম অসুখ বাড়ছে, কর্মক্ষমতা কমে যাচ্ছে। মাদকে আসক্ত হয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ স্বাভাবিক কাজকর্ম থেকে ছিটকে পড়ছেন। ফলে ব্যক্তি ও পরিবার যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি ব্যাহত হচ্ছে দেশের সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা। কাজেই মাদককে শুধু স্বাস্থ্যের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথেও এটি বড় বাধা।

অপরাধ বেড়ে যাওয়ার পেছনেও মাদকের ভূমিকা কম নয়। আসক্তি থেকে টাকার চাহিদা তৈরি হয়, আর সেই টাকা জোগাড় করতে গিয়ে অনেকেই চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি কিংবা সহিংস অপরাধে জড়িয়ে পড়েন। মাদকের কারবার ঘিরে তৈরি হয় সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র, যার প্রভাব গিয়ে পড়ে সমাজের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলায়। তবে উদ্বেগের সবচেয়ে বড় জায়গা হলো তরুণ সমাজ। দেশের অর্থনীতি আর আগামী দিনের নেতৃত্বের চালিকাশক্তি হওয়ার কথা যাদের, সেই তরুণদের একটি অংশ মাদকের টানে বিপথে যাচ্ছে, নষ্ট হচ্ছে তাদের সম্ভাবনা।

নানা দেশের অভিজ্ঞতা বলছে, মাদক নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন, সেই আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ এবং রাষ্ট্রের কার্যকর নজরদারি বড় ভূমিকা রাখে। আধুনিক সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠাতা ও দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ মাদককে অপরাধের প্রধান উৎসগুলোর একটি বলে মনে করতেন। তাঁর বক্তব্যের মূল কথা ছিল—মাদকের বিস্তার ঠেকানো না গেলে নিরাপদ ও শৃঙ্খলাবদ্ধ সমাজ গড়ে তোলা কঠিন।

তাঁর সরকারের কঠোর মাদকনীতির প্রতিফলন দেখা যায় ১৯৭৩ সালে প্রণীত ‘মিসইউস অব ড্রাগস অ্যাক্ট’-এ। নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি মাদক রাখা ও পাচারের অপরাধে এ আইনে মৃত্যুদণ্ডের বিধান যুক্ত করা হয়। আন্তর্জাতিক মহল সমালোচনা করলেও দেশের নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে আইনটিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে এর পক্ষে অবস্থান নেন লি কুয়ান ইউ। মাদকবিরোধী অভিযান, তল্লাশি ও নজরদারির জন্য দেশটির সেন্ট্রাল নারকোটিকস ব্যুরোর হাতে দেওয়া হয় ব্যাপক ক্ষমতা। কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ আর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের সুবাদে মাদক নিয়ন্ত্রণে বিশ্বের সফলতম দেশগুলোর একটি হিসেবে পরিচিতি পায় সিঙ্গাপুর। দেশটিতে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় এই নীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

কঠোর অবস্থানের পথে হাঁটছে আরও কয়েকটি দেশ। মালয়েশিয়ায় বিশেষ কিছু মাদক পাচারের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। সেখানে মাদক রাখা বা সেবন করলেও কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান আছে। কোনো বিদেশি নাগরিক মাদকসহ ধরা পড়লে তাঁর বিরুদ্ধে অভিবাসন আইনেও ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। মাদক পাচারের গুরুতর অপরাধে থাইল্যান্ডেও রয়েছে কঠোর শাস্তি। সৌদি আরবে মাদক পাচারের অপরাধে মৃত্যুদণ্ড হতে পারে। কুয়েত, কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের নানা দেশেও মাদকসংক্রান্ত অপরাধের শাস্তি কঠোর। মাদক পাচারের দায়ে মৃত্যুদণ্ডের বিধান আছে ইন্দোনেশিয়াতেও।

মাদক নিয়ন্ত্রণকে বহু বছর ধরেই রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে দেখে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৭১ সালে দেশটির তখনকার প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন মাদককে অন্যতম প্রধান শত্রু ঘোষণা দিয়ে এর বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান শুরু করেন, যা পরে ‘ওয়ার অন ড্রাগস’ বা মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নামে পরিচিত হয়। মাদকের উৎপাদন, পাচার ও সরবরাহের নেটওয়ার্ক ভেঙে দিয়ে নাগরিকদের সুরক্ষা দেওয়া ছিল এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্যগুলোর একটি। পরে যুক্তরাষ্ট্রের মাদকবিরোধী নীতি আন্তর্জাতিক পরিসরেও ছড়িয়ে পড়ে। তবে এই নীতি কতটা কার্যকর এবং এর মানবাধিকারসংক্রান্ত নানা দিক নিয়ে বিতর্ক চলছে দীর্ঘদিন ধরে।

বিশ্বজুড়ে আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে ফিলিপাইনের সাবেক প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তের মাদকবিরোধী অভিযানও। দাভাও সিটির মেয়র থাকার সময়েই তিনি মাদক ও অপরাধ দমনে কঠোর অবস্থান নেন, ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরও সেই নীতি বহাল রাখেন। ২০২২ সাল পর্যন্ত তাঁর শাসনামলে চালানো অভিযানে বহু মানুষের মৃত্যু হয়। এসব হত্যাকাণ্ডের বৈধতা আর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র সমালোচনা হয়। ২০২৫ সালে গ্রেপ্তারের পর তাঁকে নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) কাছে পাঠানো হয়, যেখানে বর্তমানে তাঁর বিচার চলছে। দেশের একাংশ মানুষ তাঁর অভিযানকে সমর্থন করলেও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ এর গ্রহণযোগ্যতাকে গুরুতর প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ফিলিপাইনের অভিজ্ঞতা এটাও মনে করিয়ে দেয় যে মাদক দমনের নামে আইন ও মানবাধিকারকে পাশ কাটালে রাষ্ট্র নতুন সংকটে পড়তে পারে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মাদক নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন আরও প্রকট। দেশে মাদকবিরোধী আইন থাকলেও তা কতটা যথাযথভাবে প্রয়োগ হচ্ছে, সে প্রশ্ন বহুদিনের। এই সুযোগে নানা এলাকায় শক্ত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে মাদক ব্যবসায়ীরা। শহর ছাড়িয়ে গ্রাম পর্যন্ত মাদকের সরবরাহ ও বিস্তার এখন উদ্বেগজনক পর্যায়ে। শিশু-কিশোর ও তরুণ থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সের মানুষ আসক্তির ঝুঁকিতে পড়ছেন। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মানুষের কর্মশক্তি, সৃজনশীলতা ও সামাজিক মূল্যবোধ।

মাদকাসক্তির সঙ্গে নানা অপরাধের যোগসূত্রও দিন দিন স্পষ্ট হচ্ছে। মাদকের টাকা জোগাতে অপরাধে জড়ানো তো আছেই, মাদক ব্যবসা নিয়ে সংঘর্ষ, খুন, অস্ত্রের ব্যবহার ও চোরাচালানের ঘটনাও ঘটছে। নারী ও শিশু নির্যাতন, যৌন সহিংসতা এবং কিশোর অপরাধেও মাদকের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। আশঙ্কা আছে, মাদক কারবারে যুক্ত অপরাধী চক্রের হাত ধরে অবৈধ অস্ত্র ও মানব পাচারের নেটওয়ার্কও বিস্তৃত হতে পারে। কিশোর গ্যাং ছড়িয়ে পড়ার পেছনে মাদক সহজে হাতের নাগালে পাওয়াকে একটি বড় উদ্বেগের কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

অপরাধ বিশ্লেষকেরা মনে করেন, দেশের অনেক অপরাধের সঙ্গেই মাদকের প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। মাদক সরবরাহ ও বিক্রির নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া গেলে অপরাধপ্রবণতা অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে। তবে কেবল অভিযান চালিয়ে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান আসবে না। উৎপাদন ও আমদানি থেকে শুরু করে পরিবহন, সরবরাহ এবং খুচরা বিক্রি—প্রতিটি ধাপে কার্যকর নজরদারির ব্যবস্থা করতে হবে।

অতীতে বিভিন্ন সরকার মাদক দমনে কঠোর হওয়ার ঘোষণা দিলেও শক্তিশালী মাদক সিন্ডিকেট পুরোপুরি ভেঙে দেওয়া যায়নি। বারবার উঠে এসেছে রাজনৈতিক প্রভাব ও পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ। এমন অভিযোগও উঠেছে যে মাদক ব্যবসায় জড়িত ব্যক্তিরা রাজনৈতিক পরিচয় কাজে লাগিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসেছেন। এসব কারণে মাদকবিরোধী অভিযান প্রায়ই প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানিয়েছেন, মাদক নির্মূলকে অগ্রাধিকার দেবে বর্তমান সরকার। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে এবং সারা দেশে অভিযান চালাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। এরপর মাদকবিরোধী কার্যক্রম জোরদার করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকা তৈরি করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

অবশ্য মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকা তৈরির উদ্যোগ এবারই প্রথম নয়। ২০২৩ সালে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের একটি ডিভিশন বেঞ্চ দেশের শীর্ষ মাদক কারবারিদের নাম-ঠিকানাসহ তালিকা জমা দিতে সরকারকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, সেই নির্দেশের পর প্রায় তিন হাজার মাদক ব্যবসায়ীর তালিকা তৈরি হলেও অজ্ঞাত কারণে তা আদালতে দাখিল করা হয়নি। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র উদ্ধৃত করে জানা গেছে, ২৯২ জন গডফাদার ও চার হাজার শীর্ষ মাদক কারবারির তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। এই তালিকা ধরে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে মাদকবিরোধী অভিযান আরও সুফল দিতে পারে।

মাদকবিরোধী অভিযানকে পুলিশের প্রধান অগ্রাধিকারগুলোর একটি বলে উল্লেখ করেছেন পুলিশের মহাপরিদর্শকও। এ নিয়ে সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। তবে অভিযানের পাশাপাশি মাদক মামলার তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার দুর্বলতাগুলো দূর করাও জরুরি। কারণ, অভিযানে ধরা পড়া অনেক আসামি পরে আইনি প্রক্রিয়ার নানা ধাপে জামিন পেয়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন। সাক্ষী না পাওয়া আর তথ্যপ্রমাণের ঘাটতির কারণে অনেক মামলা শেষ পর্যন্ত প্রত্যাশিত পরিণতিতে পৌঁছায় না।

প্রচলিত আইনে মাদক চোরাচালানের মতো গুরুতর অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। কিন্তু কঠোর শাস্তির বিধান থাকাই মাদক নিয়ন্ত্রণের জন্য যথেষ্ট নয়। অপরাধ প্রমাণে দরকার নির্ভরযোগ্য তদন্ত, যথেষ্ট সাক্ষ্যপ্রমাণ, দ্রুত বিচার এবং রায়ের কার্যকর বাস্তবায়ন। সেই সঙ্গে মাদক ব্যবসার অর্থের উৎস, এর পেছনের প্রভাবশালী পৃষ্ঠপোষক এবং সংঘবদ্ধ নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।

মাদকের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জিততে হলে রাষ্ট্রের উদ্যোগের সঙ্গে সামাজিক আন্দোলনও গড়ে তুলতে হবে। এ দায়িত্ব যৌথভাবে নিতে হবে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠন এবং জনপ্রতিনিধিদের। সংসদ সদস্যদের নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকা মাদকমুক্ত করতে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা দেওয়া যেতে পারে। এলাকার মানুষকে সঙ্গে নিয়ে সচেতনতা, প্রতিরোধ ও পুনর্বাসনের কাজ চালানো গেলে এর সুফল মিলবে।

মাদকাসক্ত মানুষকে কেবল অপরাধী হিসেবে না দেখে তাদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ নিশ্চিত করাও জরুরি। আবার মাদকের উৎপাদনকারী, সরবরাহকারী, ব্যবসায়ী ও সিন্ডিকেটের পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে নিতে হবে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা। মাদক কারবারে জড়িতদের রাজনৈতিক পরিচয় বা সামাজিক প্রভাব যাতে কোনোভাবেই আইন প্রয়োগের পথে বাধা না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।

মাদক নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে ডোপ টেস্টের কার্যকর প্রয়োগ। গাড়িচালকদের ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ থাকলেও বাস্তবে তা কতটা কার্যকর, তা খতিয়ে দেখা দরকার। সরকারি চাকরিতে নিয়োগের সময় ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করার বিষয়টিও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, পেশাগত প্রশিক্ষণ ও ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় নিয়োগে আইনসম্মত ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ডোপ টেস্ট চালু করার কথা ভাবা যেতে পারে। তবে এসব পরীক্ষায় ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, যথাযথ প্রক্রিয়া এবং পরীক্ষার নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করা জরুরি।

সবচেয়ে বড় কাজ হলো মাদক ব্যবসায়ীদের রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় বন্ধ করা। অতীত অভিজ্ঞতা বলে, ক্ষমতার হাতবদল হলেই মাদক ব্যবসায়ীদের একটি অংশ নতুন রাজনৈতিক বলয়ে ভিড়তে চেষ্টা করে। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা পেলে অপরাধীদের শক্তি আরও বাড়ে, আর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে তাদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষভাবে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে যায়। এই অবস্থা থেকে বের হতে হলে মাদক ব্যবসায়ী, চোরাচালানি ও মাদক সিন্ডিকেটের গডফাদারদের আশ্রয় না দেওয়ার প্রশ্নে সব রাজনৈতিক দলকে একমত হতে হবে।

দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি, সামাজিক নিরাপত্তা আর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষা—সবকিছুর সঙ্গেই মাদক নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন সরাসরি যুক্ত। তাই মাদকবিরোধী অভিযানকে সাময়িক কর্মসূচি ভাবার অবকাশ নেই; একে দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকারে পরিণত করতে হবে। আইনের কঠোর প্রয়োগ, নিরপেক্ষ বিচার, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সামাজিক সচেতনতা এবং আসক্তদের পুনর্বাসন—এসবের সমন্বিত উদ্যোগেই এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব।

মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের জন্য একটি বড় পরীক্ষা। এ লড়াইয়ে সফল হলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি দেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা, অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং নিরাপদ সমাজ গড়ার পথও সহজ হবে। মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়া গেলে দেশের এগিয়ে চলা আরও জোরালো হবে। কেননা মাদকের বিরুদ্ধে জয় মানে সুস্থ, নিরাপদ, কর্মক্ষম ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার পথে একটি বড় বিজয়।



কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ